কাজী তৌফিক এলাহী তারেক: বাংলাদেশে গ্যাস সংকট আজ আর কেবল জ্বালানি খাতের একটি সমস্যা নয়; এটি দেশের অর্থনীতি, শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি জাতীয় সংকট। গ্যাসের চাপ কমে গেলে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়, বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন কমে যায়, সার কারখানার কার্যক্রমে সমস্যা দেখা দেয় এবং এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত বাজারদর ও কর্মসংস্থানের ওপরও পড়ে। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—বাংলাদেশে গ্যাসের এই সংকট কি কেবল প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত কমে যাওয়ার কারণে, নাকি এর পেছনে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও অব্যবস্থাপনাও দায়ী?
রাজনৈতিক বিতর্কে একটি অভিযোগ প্রায়ই সামনে আসে—দেশে গ্যাস সংকটের একটি বড় অংশ নাকি প্রাকৃতিক নয়, বরং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বিএনপির শাসনামলে গ্যাস খাতের ব্যবস্থাপনা, অনুসন্ধান, বিনিয়োগ ও বিতরণব্যবস্থা নিয়ে যে প্রশ্নগুলো উঠেছিল, সেগুলো আজ নতুন করে আলোচনায় আসছে। তবে এই অভিযোগকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি সরকারি নথি, উৎপাদন পরিসংখ্যান, চুক্তি এবং প্রকল্পের তথ্য বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের গ্যাস খাতের সবচেয়ে বড় দুর্বলতাগুলোর একটি হলো দীর্ঘমেয়াদি অনুসন্ধানের ঘাটতি। একটি গ্যাসক্ষেত্রের মজুত অসীম নয়। পুরোনো ক্ষেত্র থেকে বছরের পর বছর গ্যাস উত্তোলন করলে একসময় উৎপাদন স্বাভাবিকভাবেই কমে আসে। সেই ঘাটতি পূরণ করতে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান ও উন্নয়ন করতে হয়। কিন্তু অনুসন্ধান কার্যক্রমে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব থাকলে ভবিষ্যতে সংকট তৈরি হওয়া অবশ্যম্ভাবী।
বিএনপির বিভিন্ন মেয়াদের শাসনামল নিয়ে সমালোচকদের একটি অভিযোগ হলো, প্রয়োজন অনুযায়ী দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং প্রভাবশালী মহলের স্বার্থের কারণে গ্যাস খাতে সম্ভাবনাময় বিনিয়োগ ও অনুসন্ধান বাধাগ্রস্ত হয়েছে—এমন অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের প্রতিটি ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট প্রমাণ আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
গ্যাস সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো গ্যাসের অবৈধ ব্যবহার ও চুরি। অবৈধ সংযোগ শুধু রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতি করে না, বরং বৈধ গ্রাহকদের জন্য সরবরাহ কমিয়ে দেয়। কোনো এলাকায় অবৈধভাবে বিপুল পরিমাণ গ্যাস ব্যবহার হলে একই পাইপলাইনের ওপর নির্ভরশীল শিল্পপ্রতিষ্ঠান বা বৈধ গ্রাহকরা স্বাভাবিক চাপ নাও পেতে পারেন। ফলে সংকটের একটি অংশ ব্যবস্থাপনাগতও হতে পারে।
এখানেই আসে ‘কৃত্রিম সংকট’ তৈরির অভিযোগ। যদি একটি দেশে পর্যাপ্ত অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও গ্যাস চুরি, অবৈধ সংযোগ, দুর্নীতি, মজুত ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা কিংবা রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে সরবরাহ সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না হয়, তাহলে সেটি নিছক প্রাকৃতিক সংকট থাকে না। সেখানে মানুষের তৈরি ব্যবস্থাপনাগত সংকটও যুক্ত হয়।
বিএনপি সরকার নজর দিয়েছে ফ্যামিলও কার্ড,প্রবাসী কার্ড আর কৃষক কার্ডের দিকে। যার মাধ্যমে দলীয় নেতাকর্মীদের পকেট ভারী হচ্ছে। সাধারন মানুষের এ ক্ষেত্রে কোনো দীর্ঘমেয়াদী সুবিধা হচ্ছে না। মানুষ এখন গ্যাস চায়, কারন দেশের অর্ধেকের ও বেশি জনগোষ্ঠী এখন গ্যাস নির্ভর। গ্যাস ছাড়া একটি দিন অতিবাহিত করা তাদের জন্য দুস্কর অথচ তারা দিনের পর দিন গ্যাস ছাড়া থাকতে হচ্ছে। যার দরুন তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যহত হচ্ছে।
এই ঘাটতি পূরণ করতে বাংলাদেশ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল হয়েছে। কিন্তু আমদানি করা গ্যাসের দাম দেশীয় গ্যাসের তুলনায় বেশি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য ওঠানামার ওপর এর ব্যয় নির্ভর করে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে শুধু LNG আমদানির ওপর নির্ভর করে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন।
বাংলাদেশের জনগণ শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক দোষারোপের চেয়ে কার্যকর সমাধান চায়। তাই প্রয়োজন একটি স্বাধীন ও স্বচ্ছ তদন্ত, যেখানে গত কয়েক দশকের গ্যাস খাতের সিদ্ধান্ত, চুক্তি, অনুসন্ধান, উৎপাদন, আমদানি, চুরি ও বিতরণব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ হিসাব জনগণের সামনে তুলে ধরা হবে। কোনো দল বা ব্যক্তি যদি রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয়ের সঙ্গে জড়িত থাকে, তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
