কে এই আরিফুল হক চৌধুরী? সিলেট কি তার হাতে নিরাপদ?

ক্রাইম; দর্পন; ক্রাইম দর্পন; crime; crimedorpon; crimedarpan; dorpon; darpan; The Weekly Crime Dorpon; the weekly crime darpan; crimedorpon.com;

মাসুদা আক্তার: সিলেট—এখানকার রাজনীতি, প্রশাসন ও সামাজিক জীবনে এক নাম যেন সবসময় আলোচনা, বিতর্ক ও প্রশ্নবিদ্ধতার কেন্দ্রবিন্দু। তিনি আরিফুল হক চৌধুরী, সংসদ সদস্য, মন্ত্রী এবং সিলেটের রাজনীতিতে ‘ডন’ হিসেবে পরিচিত এক ব্যক্তিত্ব। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হয়েও তার নাম জড়িয়েছে গ্রেনেড হামলা, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক আঁতাত ও জনস্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডের মতো গুরুতর অভিযোগ। প্রশ্ন উঠছে—তার হাতে কি সত্যিই নিরাপদ সিলেট ও এর জনগণ?

২০০৪ সালের সুনামগঞ্জ গ্রেনেড হামলা: ২২ বছর পর খালাস
২০০৪ সালে সুনামগঞ্জে আওয়ামী লীগ নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের জনসভায় ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা ও হত্যাচেষ্টার ঘটনা দেশজোড়া সাড়া জাগিয়েছিল। ওই হামলার মূল পরিকল্পনাকারী আরিফুল হক চৌধুরীর নাম মামলার তদন্ত ও অভিযোগপত্রে। দীর্ঘ ২২ বছর অপেক্ষার পর ২০২৬ সালের জুন মাসে সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল তাকে এই মামলা থেকে সম্পূর্ণ খালাস প্রদান করে। কিন্তু এই খালাসের সিদ্ধান্তই রাজনৈতিক মহল ও সাধারণ জনগণের মাঝে নতুন প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে। অনেকের দাবি—এই খালাস তার ক্ষমতা ও রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে অর্জন করা হয়েছে, যা বিচার ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থাকে ক্ষুণ্ন করছে। দুর্নীতি ও আর্থিক অনিয়ম: বারবার অভিযোগ, ২০০৭ সালে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তালিকায় আরিফুল হক চৌধুরীর নাম আসে। একটি সরকারি ঠিকাদারি কাজের বিপরীতে ২ কোটি টাকা চাঁদা নেওয়ার অভিযোগ তোলা হয়। তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়েছিল এবং কিছুদিন কারাগারেও অবস্থান করেন। সেই সময় থেকেই তার বিরুদ্ধে প্রভাব খাটিয়ে কাজ বুঝিয়ে দেওয়া, অনৈতিক আর্থিক লেনদেন ও প্রভাবের অপব্যবহারের অভিযোগ ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে।সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র থাকাকালীন ২০১৯ সালে নগর ভবন নির্মাণ কাজকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ চাঁদাবাজি ও প্রতারণার ঘটনা ঘটে। একজন ঠিকাদারের অভিযোগ—মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী তার কাছ থেকে ১ কোটি ৫৮ লাখ টাকা আত্মসাত করেন, কাজের বিল পরিশোধ না করে কাজ বন্ধ রাখার হুমকি দেন এবং এমনকি শারীরিক নির্যাতনও করা হয়। এই ঘটনা সিলেটজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি করেছিল, কিন্তু তিনি তার ক্ষমতার অপব্যবহার করে সেই অভিযোগ থেকেও রেহাই পান l রাজনৈতিক আঁতাত ও নির্বাচনী প্রভাব: সাধারণ ভোটারের আস্থা ক্ষুণ্ন নির্বাচনে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী। ভোটের আগে জামায়াত ও স্থানীয় আওয়ামী লীগের একটি অংশের সাথে তার গোপন সমঝোতা বা আঁতাত করেন এবং বিভিন্ন ভয়ভীতি দেখিয়ে তাদের সমঝোতায় বাধ্য করেন বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরনের আঁতাত ও প্রভাবের প্রয়োগ সাধারণ ভোটারদের আস্থা নষ্ট করছে এবং নির্বাচনী পরিবেশকে বিকৃত করছে। ভোট জালিয়াতির মাধ্যমে বিপুল ভোট পেয়ে নির্বাচিত হওয়ার অভিযোগও তার বিরুদ্ধে উঠে এসেছে বারবার।

বিমান টিকিটের দাম বৃদ্ধি: সিন্ডিকেটের গডফাদার হিসেবে অভিযোগ মন্ত্রী হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যগামী বিমান টিকিটের দাম আকাশছোঁয়া বেড়ে যায়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক ট্রল ও সমালোচনা শুরু হয়েছে। সাধারণ যাত্রী ও প্রবাসী বাংলাদেশিরা বলছেন, তিনি বিমান সিন্ডিকেট ভাঙতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন—অনেকের দাবি, টিকিটের মূল্যবৃদ্ধির পেছনে পরোক্ষভাবে তার হাত রয়েছে। কিন্তু এই বিষয়ে তিনি কখনো স্পষ্ট বা সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দেননি। মন্ত্রী হওয়ার পর কারো তাকে প্রশ্ন করার সাহস হয় না—এমনই পরিবেশ তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে।শেষ কথা: সিলেট কি তার হাতে নিরাপদ? দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে একাধিক গুরুতর অভিযোগ, মামলা ও বিতর্ক সত্ত্বেও আরিফুল হক চৌধুরী ক্ষমতায় আরোহণ করছেন এবং প্রভাব বিস্তার করছেন। প্রশ্নটি এখন শুধু তার ব্যক্তিগত নয়—এটি সিলেটের মানুষের, দেশের রাজনীতির ও বিচার ব্যবস্থার প্রশ্ন। বিচার, নির্বাচন ও প্রশাসন যদি ক্ষমতার কাছে নতি স্বীকার করে, তবে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও অধিকার কোথায় পাবে? সিলেটবাসী আজ এই প্রশ্নটি নিয়েই ভাবছেন—কে এই আরিফ? তার হাতে কি সত্যিই নিরাপদ আমার সিলেট?