বাংলাদেশে আত্মগোপন কি আর সম্ভব? মোবাইলের অবস্থান থেকে ইন্টারনেট ট্রাফিক নজরদারি প্রযুক্তির অদৃশ্য জালে কতটা নিরাপদ একজন মানুষ?

ক্রাইম; দর্পন; ক্রাইম দর্পন; crime; crimedorpon; crimedarpan; dorpon; darpan; The Weekly Crime Dorpon; the weekly crime darpan; crimedorpon.com;

বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ডকুমেন্টারি: আধুনিক নজরদারি প্রযুক্তির বিস্তার নিয়ে বাংলাদেশ সম্পর্কে গত কয়েক বছরে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত তথ্য এবং মানবাধিকার সংস্থার গবেষণা বলছে একজন মানুষের ডিজিটাল উপস্থিতি আগের তুলনায় অনেক বেশি শনাক্তযোগ্য হয়ে উঠেছে। তাই বাস্তব সত্য যে, “বাংলাদেশে কোনো অপরাধী কোথাও লুকিয়ে থাকা প্রায় অসম্ভব।

এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো
বাংলাদেশে রাষ্ট্রের হাতে এমন কী ধরনের প্রযুক্তি এসেছে, যার কারণে একজন আত্মগোপনে থাকা ব্যক্তির জন্য সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে থাকা কঠিন বা অসম্ভব
হবে ?

১. গল্পের শুরু মোবাইল ফোন থেকে।
আজকের পৃথিবীতে একজন মানুষের সঙ্গে সবচেয়ে শক্তিশালী ডিজিটাল পরিচয়গুলোর একটি হলো তাঁর মোবাইল ফোন।
ফোনটি কার নামে নিবন্ধিত, কোন সেল টাওয়ারের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, কখন কোন এলাকায় ছিল এসব তথ্য একজন ব্যক্তির গতিবিধি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় নজরদারি সক্ষমতা নিয়ে Freedom House-এর বিভিন্ন প্রতিবেদনে মোবাইল interception, IMSI catcher এবং অন্যান্য surveillance technology ব্যবহারের তথ্য উঠে এসেছে।
২০১৯ সালে RAB একটি কানাডীয় প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে IMSI-catcher প্রযুক্তি সংগ্রহ করেছিল বলে Freedom House উল্লেখ করেছে। এই ধরনের যন্ত্র একটি ছোট মোবাইল টাওয়ারের মতো কাজ করে আশপাশের মোবাইল ফোন শনাক্ত করতে পারে।
অর্থাৎ কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় কোনো ব্যক্তি উপস্থিত থাকলে তাঁর মোবাইল ডিভাইস সেই এলাকার মোবাইল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যোগাযোগ করার কারণে তদন্তকারীদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল সূত্র তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশের RAB এর কাছে এখনও এই প্রযুক্তি বিদ্যমান রয়েছে।

২. P6 Intercept: শত শত মোবাইল শনাক্ত করার অভিযোগ
২০২১ সালে Al Jazeera এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বাংলাদেশের নজরদারি সক্ষমতা নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করে।
প্রতিবেদনটির দাবি ছিল, বাংলাদেশের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা DGFI ২০১৮ সালে P6 Intercept নামের একটি IMSI-catcher ব্যবস্থা সংগ্রহ করেছিল।
Al Jazeera যে নথি ও অনুসন্ধানী তথ্য প্রকাশ করেছিল, তাতে প্রযুক্তিটির প্রস্তুতকারক হিসেবে ইসরায়েলভিত্তিক PicSix এর নাম উঠে আসে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্রয় প্রক্রিয়ায় হাঙ্গেরির একটি প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করা হয়েছিল এবং PicSix এর বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো IMSI-catcher প্রযুক্তি একই এলাকায় থাকা বহু মোবাইল ডিভাইস শনাক্ত করার কাজে ব্যবহার করা যায়।
Al Jazeera এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, এ ধরনের প্রযুক্তি বিক্ষোভ বা সমাবেশে উপস্থিত শত শত মানুষের মোবাইল শনাক্ত করতেও ব্যবহারযোগ্য। বাংলাদেশের DGFI এর কাছে এখনও এই IMSI-catcher ব্যবস্থা সংরক্ষিত রয়েছে।

৩. Spearhead: নজরদারি ভ্যান।
এরপর আসে আরও উন্নত প্রযুক্তির অভিযোগ।
২০২৩ সালে Haaretz-এর প্রতিবেদনের ভিত্তিতে Freedom House জানায়, বাংলাদেশের National Telecommunication Monitoring Centre বা NTMC একটি Spearhead নামের vehicle-mounted surveillance system সংগ্রহ করেছে। যাহা এখনও সংগ্রহে আছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ব্যবস্থা প্রায় ৫০০ মিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে থাকা টার্গেটের ওপর নজরদারি করতে সক্ষম এবং encrypted messages ও chats সহ বিভিন্ন ধরনের যোগাযোগ intercept করার সক্ষমতার কথা বলা হয়েছে।
Freedom House আরও উল্লেখ করেছে, একটি ইউনিট ২০২২ সালের জুনে ঢাকায় পৌঁছেছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।

৪. ফোনের ভেতরের তথ্যও কি উদ্ধার করা সম্ভব?
এখানে নজরদারির আরেকটি স্তর তৈরি হয়।
২০২১ সালে Al Jazeera ও Haaretz এর যৌথ অনুসন্ধানে বাংলাদেশের সরকারি সংস্থার সঙ্গে Cellebrite UFED প্রযুক্তির সম্পর্কের তথ্য প্রকাশিত হয়।
UFED সাধারণ network surveillance system নয়।
এটি একটি digital forensic/data extraction tool।
অর্থাৎ কোনো মোবাইল ফোন তদন্তকারীদের হাতে এলে সেটি থেকে বিভিন্ন ধরনের তথ্য উদ্ধার ও বিশ্লেষণের কাজে এটি ব্যবহার করা যায়।
Al Jazeera এর প্রকাশিত নথি অনুযায়ী, বাংলাদেশ সরকার কমপক্ষে ৩৩০,০০০ মার্কিন ডলার মূল্যের Cellebrite ফোন hacking equipment কিনেছে বলে দাবি করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, RAB সহ বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের এই প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে।
Freedom House একই বিষয়ে Cellebrite UFED এর মাধ্যমে মোবাইল ফোন থেকে তথ্য access ও extraction এর কথা উল্লেখ করেছে।
অর্থাৎ তদন্তকারীদের হাতে যদি কোনো ব্যক্তির মোবাইল ফোন চলে আসে, তখন তাঁর সম্পুর্ণ
ডিজিটাল জীবন তদন্তের আওতায় আসতে পারে। বাংলাদেশ সরকারের কাছে এই
network surveillance system এখনও বিদ্যমান রয়েছে।

৫. Pegasus এর গল্প: এখানে সতর্ক থাকা জরুরি, কারণ
বাংলাদেশের নজরদারি প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা হলেই Pegasus এর নাম প্রায়ই আসে।
Citizen Lab ২০১৮ সালে বাংলাদেশে Pegasus এর উপস্থিতির বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছিল বলে Freedom House উল্লেখ করেছে। পরবর্তীতে বাংলাদেশের High Court Pegasus ব্যবহারের অভিযোগের তদন্ত না হওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। মোটকথা বাংলাদেশে Pegasus ব্যবহার নিয়ে আন্তর্জাতিক গবেষণা ও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সুতরাং বাংলাদেশে Pegasus এর মতো নিষিদ্ধ নজরদারি প্রযুক্তি এখনও বিদ্যমান রয়েছে।

৬. শুধু মোবাইল নয় ইন্টারনেটও নজরদারির আওতায় রয়েছে।
নজরদারির সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এখানেই।
একজন মানুষ নিজের মোবাইল ফোন ব্যবহার না করলেও যদি internet ব্যবহার করে, তাহলে তাঁর digital footprint তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশে Deep Packet Inspection বা DPI সহ network monitoring প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়ে বহু বছর ধরেই প্রতিবেদন প্রকাশিত হইতেছে।
Freedom House এর ২০২০ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, সরকার internet traffic বিশ্লেষণের জন্য DPI ভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা করেছে । একই প্রতিবেদনে NTMC এর lawful interception সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কোম্পানির প্রযুক্তি সংগ্রহের পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করা হয়।
সহজ ভাষায়: মোবাইল ফোন হলো একজন মানুষের ডিজিটাল পরিচয়ের একটি দরজা। Internet traffic হলো আরেকটি দরজা। আর সব দরজাতেই বাংলাদেশ সরকারের কড়া নজরদারির ব্যবস্থা রয়েছে।

৭. ২০২৬ সালে ৯৫ কোটি টাকার নতুন অধ্যায়।
বাংলাদেশে Facebook নজরদারি সক্ষমতা নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এসেছে চলতি বৎসর অর্থাৎ ২০২৬ সালে।
২৯ মে ২০২৬ তারিখে The Business Standard জানায়, NTMC-এর Content Blocking & Filtering System সম্প্রসারণের জন্য সরকার প্রায় ৯৫ কোটি টাকা ব্যয়ের একটি ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন করেছে।
প্রকল্পটির নাম: “Expansion of Content Blocking & Filtering System (Phase-1)”
প্রকল্পটি Ministry of Home Affairs-এর মাধ্যমে প্রস্তাবিত হয় এবং Cabinet Committee on Government Purchase সেটি অনুমোদন করে। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্য।
কারণ এটি দেখায় যে বাংলাদেশের network-level content monitoring ও filtering অবকাঠামো সময়ের সঙ্গে আরও সম্প্রসারিত হচ্ছে।

৮. বাংলাদেশে আত্মগোপনে থাকা অপরাধীর জন্য সমস্যা কোথায়?
ধরা যাক একজন ব্যক্তি আত্মগোপনে আছেন।
তাঁর কাছে মোবাইল ফোন আছে।
ফোন চালু করলে মোবাইল নেটওয়ার্ক, SIM, cell tower, location data একটি সূত্র তৈরি হবে।
Internet ব্যবহার করলে
Internet connection, network traffic, digital footprint
আরেকটি সূত্র তৈরি হবে।
কোনো তদন্তে তাঁর ফোন জব্দ হলে Mobile device, forensic extraction, stored digital evidence আরও একটি সূত্র তৈরি হবে।
তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করলে Account, posts, contacts, metadata, digital activity তদন্তের সম্ভাব্য সূত্র তৈরি করবে।
উপরোক্ত বিষয়গুলো একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা হলে একজন ব্যক্তির গতিবিধি সম্পর্কে নিশ্চিৎ একটি digital pattern তৈরি করা সম্ভব হবে। এবং আত্মগোপনে থাকা অসম্ভব হবে।
অতএব সবচেয়ে সঠিক বক্তব্য হবে: বাংলাদেশে নজরদারি প্রযুক্তির বিস্তার এই পরিমান উন্নত হয়েছে যে একজন ব্যক্তির সম্পূর্ণ ডিজিটাল অদৃশ্যতা অর্জনকে আগের তুলনায় অনেক কঠিন তথা অসম্ভব করে তুলেছে।

৯. বাংলাদেশের মতো একটি রাষ্ট্রের হাতে নজরদারি প্রযুক্তির
কতগুলো স্তর তৈরি হয়েছে?
প্রকাশিত আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনগুলো একত্র করলে বাংলাদেশের কাছে কয়েক ধরনের surveillance capability-এর প্রমাণ পাওয়া যায়।
(ক) IMSI Catcher
মোবাইল ডিভাইস শনাক্ত ও mobile-network traffic interception-এর জন্য।
(খ) P6 Intercept-এর মতো mobile interception technology
Al Jazeera এর অনুসন্ধানে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে দাবি করা হয়েছে।
(গ) Spearhead surveillance system
NTMC-এর সঙ্গে সম্পর্কিত বলে Haaretz-ভিত্তিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
(ঘ) Cellebrite UFED
জব্দ করা mobile phone থেকে digital evidence সংগ্রহের forensic tool।
(ঙ) DPI ও network monitoring
Internet traffic বিশ্লেষণ, filtering এবং blocking-এর জন্য ব্যবহৃত প্রযুক্তি।
(চ) Pegasus এর মতো নিষিদ্ধ নজরদারি প্রযুক্তি।
(ছ) Content Blocking & Filtering infrastructure
২০২৬ সালে NTMC-এর জন্য প্রায় ৯৫ কোটি টাকার সম্প্রসারণ প্রকল্প অনুমোদনের তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
সুতরাং বর্তমানে বাংলাদেশে কোনো অপরাধী আত্মগোপনে থাকা সম্ভব নয়।

১০. বাংলাদেশের প্রশাসনের নজরদারি প্রযুক্তি নিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর উদ্বেগ কেন?
Freedom House-এর সাম্প্রতিক Bangladesh report-গুলোতে surveillance technology নিয়ে ধারাবাহিক উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
তাদের প্রতিবেদনে P6 Intercept, Spearhead, IMSI catcher এবং Cellebrite-এর মতো প্রযুক্তির কথা এসেছে। একই সঙ্গে তারা বাংলাদেশের আইনি কাঠামোর অধীনে communications interception এর ক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
এখানে বিষয়টি শুধু অপরাধী ধরার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

একই প্রযুক্তি যদি যথাযথ আইনি নিয়ন্ত্রণ ছাড়া ব্যবহার করা হয়, তাহলে তার প্রভাব পড়তে পারে
সাংবাদিকের ওপর, রাজনৈতিক কর্মীর ওপর, মানবাধিকারকর্মীর ওপর এবং সাধারণ নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার ওপর।
অর্থাৎ যে প্রযুক্তি একজন অপরাধীকে শনাক্ত করতে সাহায্য করতে পারে, একই প্রযুক্তি অপব্যবহার হলে একজন নিরপরাধ মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতার জন্যও হুমকি হতে পারে। আর বাংলাদেশে এ-সব প্রযুক্তির অপব্যবহার হওয়াটাই স্বাভাবিক। কেননা অপরাধী শনাক্ত করার প্রযুক্তি যে নিরপরাধ মানুষের ওপর নির্বিচারে নজরদারির প্রযুক্তি হিসেবে ব্যবহার করা হবেনা তার নিশ্চয়তা কোথা? বাংলাদেশে ইহার কোনো নিশ্চয়তা নাই। কারণ বাংলাদেশে এ-সব প্রযুক্তি ব্যবহারকারীদের উপর সরকারের যথাযথ আইনি নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহিতা নাই।

 * উপসংহার *

বাংলাদেশে গত এক দশকে surveillance technology এর যে চিত্র আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, মানবাধিকার গবেষণা এবং প্রকাশিত সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত তথ্যের মাধ্যমে সামনে এসেছে, তা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ।
P6 Intercept নিয়ে Al Jazeera এর অনুসন্ধান, Cellebrite UFED নিয়ে Al Jazeera ও Haaretz এর প্রকাশিত নথি, Spearhead নিয়ে Haaretz ভিত্তিক প্রতিবেদন, IMSI catcher ও অন্যান্য প্রযুক্তি নিয়ে Freedom House এর গবেষণা নিষিদ্ধ Pegasus প্রযুক্তি
এবং ২০২৬ সালে NTMC এর content blocking infrastructure সম্প্রসারণের জন্য প্রায় ৯৫ কোটি টাকার সরকারি অনুমোদন, সবকিছু মিলিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট: বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় ডিজিটাল নজরদারি ও network monitoring সক্ষমতা সময়ের সঙ্গে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

তাই একজন অপরাধীর জন্য নিজের ডিজিটাল পরিচয়, মোবাইল সংযোগ, যোগাযোগ এবং অনলাইন কার্যকলাপের কোনো চিহ্নই না রেখে দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকা আগের তুলনায় অনেক কঠিন। আর শুধু কঠিনই নয় বরং অসম্ভব। উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ্য যে শহীদ প্রসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হত্যাকারী মেজর মোজাফফর হোসেন দীর্ঘ ৪৫ বৎসর পর বাংলাদেশে প্রবেশ করা মাত্রই বিগত ১৫ জুলাই দিবাগত রাতে গ্রেফতার করা হয়েছে। BD TODAY এর রিপোর্ট অনুযায়ী এই সরকারের সময়ে মাত্র ২২ দিনে পাচজনকে সরকারের বিরুদ্ধে লেখালেখির জন্য আটকের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া Human Rights Watch ও CIVICUS Monitor এর রিপোর্ট অনুযায়ী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এর নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর সরকার বা সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রম অথবা সরকারের এমপি মন্ত্রীদের গঠনমূলক সমালোচনা করে ফেসবুকে পোস্ট বা বক্তব্যের কারণে অনেকই গ্রেপ্তার, মামলা, হামলার শিকার হয়েছেন। আর শুধু তাই নয় বরং প্রবাসীরা বাংলাদেশের বাহিরে থেকে ফেইসবুকে সরকারের সমালোচনা করলে দেশে তাদের পরিবার হয়রানির শিকার হতে হয়,যেমন বিগত ৮ জুলাই ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত NABA News24 এর প্রতিবেদন অনুযায়ী এক প্রবাসী লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জের এমপিকে নিয়ে ফেইসবুকে পোস্ট করার কারণে স্থানীয় বিএনপি নেতা দলবলসহ ঐ প্রবাসীর বাড়িতে গিয়ে হুমকি ধমকি দিতেছে। এই সরকারকে নিয়ে লেখালেখির কারণে শুধুযে সাধারণ মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছে তা নয় বরং সাংবাদিকরাও হয়রানির শিকার হচ্ছেন। যেমন The Daily Star এর ৭ মে ২০২৬ এর সম্পাদকীয়তে বলা হয়, এপ্রিল মাসে ৭৫ জন সাংবাদিক হয়রানির শিকার হয়েছেন।
CIVICUS এর সংকলিত তথ্য অনুযায়ী, ১৮ ফেব্রুয়ারি হইতে ৩১ মার্চ ২০২৬ এই সময়ের মধ্যে দায়িত্ব পালনকালে ২৫ জন সাংবাদিক আহত, ৩ জন সাংবাদিক হামলার শিকার,
৭ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে । সুতরাং বাংলাদেশে সরকার, ক্ষমতাসীন দল, সরকারের মন্ত্রী, এমপিদের সমালোচনা করে আত্মরক্ষা কাহারও পক্ষে সম্ভব নয়।

  শেষ কথ*

মনে করেন একজন মানুষ তার জীবন রক্ষার্থে আত্মগোপনে গেলেন। নিজের মোবাইল ফোন বন্ধ করে দিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার বন্ধ করলেন। পরিচিতদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ এড়িয়ে চললেন। একেবারে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেন। তাহলে তো তার জীবন যাপান নিতান্তই মানবেতর ও অমানবিক হয়ে গেল, বর্তমান যুগে এভাবে জনবিচ্ছিন্ন জীবন যাপান আদৌ সম্ভবপর নয়।


এর পরেও যদি তিনি তর্কের খাতিরে কিছু সময়ের জন্য অসম্ভবকে সম্ভব মনে করে অমানবিক জীবন যাপন গ্রহণ করে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে আত্মগোপনে চলে যান, তাহলে কি তিনি সম্পূর্ণভাবে অদৃশ্য হয়ে গেলেন? তিনি কি প্রশাসন ও ক্ষমতাসীন দলের চোখ ফাঁকি দিয়ে নিজের জীবন রক্ষা করতে পারবেন? তিনি কি গ্রেফতার এড়াতে পারবেন? এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর হলো আধুনিক প্রযুক্তির যুগে ইহা মোটেই সম্ভব নয়, তিনি প্রশাসন ও ক্ষমতাসীন দলের চোখ ফাঁকি দিতে পারবেন না, তিনি গ্রেফতার এড়াতে পারবেন না, তার এমন পরিকল্পনা হবে একটি আকাশকুসুম কল্পনা।

কারণ একজন মানুষ মোবাইল ফোন ব্যবহার বন্ধ করলেও, তাঁর আগের মোবাইল ব্যবহার, SIM ও যোগাযোগের তথ্য, ইন্টারনেট ব্যবহারের রেকর্ড, বিভিন্ন ডিজিটাল অ্যাকাউন্ট এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত তথ্য তদন্তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে থাকতে পারে। আর তিনি যদি কোনো সময় আবার মোবাইল ফোন বা ইন্টারনেট ব্যবহার করেন, তখনও নতুন করে ডিজিটাল তথ্যের চিহ্ন তৈরি হতে পারে। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গণমাধ্যমে তার ছবি,ভিডিও, বক্তৃতা, সাক্ষাৎকার ইত্যাদি সহজেই তাকে আত্মগোপন থেকে আত্মপ্রকাশ করে দিবে।

বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে মোবাইল যোগাযোগ শনাক্তকরণ, ইন্টারনেট ট্রাফিক পর্যবেক্ষণ, ডিজিটাল ফরেনসিক এবং কনটেন্ট ফিল্টারিংয়ের মতো বিভিন্ন প্রযুক্তির ব্যবহার ও সক্ষমতা নিয়ে দেশি বিদেশি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এসবের মাধ্যমে প্রমাণিত যে বাংলাদেশে কহারও পক্ষে আত্মগোপন করে সরকার ও ক্ষমতাসীন দল থেকে আত্মরক্ষা সম্ভব নয়।

Leave a Reply