ইয়াহইয়া আহমদ তানহার: বিরোধী দলে থাকলে প্রশ্ন তোলা সহজ, কিন্তু ক্ষমতায় থাকলে সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়। আর ঠিক এখানেই বিএনপির আসল পরীক্ষা। দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াই, আন্দোলন-সংগ্রাম এবং পরিবর্তনের নানা প্রতিশ্রুতির পর বিএনপি এখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে। জনগণ তাদের হাতে ক্ষমতা দিয়েছে, তবে সেই ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত করে দিয়েছে একটি কঠিন শর্ত—কথার সঙ্গে কাজের মিল দেখাতে হবে। কারণ মানুষ শুধু সরকার পরিবর্তন চায়নি, তারা চেয়েছে শাসনের ধরন বদলাতে।
ক্ষমতার সময় যত গড়াচ্ছে, জনগণের প্রশ্নও তত বাড়ছে। নির্বাচনের আগে যে প্রতিশ্রুতিগুলো রাজনৈতিক বক্তব্যের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল, সেগুলোর কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে? সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা পরিবর্তন এসেছে, বাজারে স্বস্তি কতটা ফিরেছে কিংবা কর্মসংস্থানের সুযোগ কতখানি বেড়েছে? দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা কি দল-মত নির্বিশেষে নেওয়া হচ্ছে, নাকি প্রশাসন এখনও পক্ষপাতদুষ্ট? এসব প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
দীর্ঘদিন বিরোধিতার রাজনীতিতে থেকে বিএনপি যেসব ব্যর্থতার সমালোচনা করেছে—দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, দুর্নীতি, প্রশাসনে দলীয়করণ কিংবা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি—আজ সেই একই রাষ্ট্রযন্ত্র তাদের হাতে। ফলে ‘আগের সরকার খারাপ ছিল’—এমন ব্যাখ্যা রাজনৈতিক আলোচনার জন্য যথেষ্ট হলেও রাষ্ট্র পরিচালনার স্থায়ী অজুহাত হতে পারে না। সরকার পরিবর্তনের পাশাপাশি যদি সাধারণ মানুষের জীবনের মান না বদলায়, তবে পরিবর্তনের সেই রাজনৈতিক স্লোগান একসময় কেবল ফাঁপা বুলিতে পরিণত হবে।
এখানে বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ হতে পারে দলীয় পরিচয়কে অনিয়মের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা। ক্ষমতায় থাকা মানেই দলের নেতাকর্মীদের রাষ্ট্রীয় সুবিধা বা অপকর্মের লাইসেন্স পাওয়া নয়। স্থানীয় পর্যায়ের কোনো নেতার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব বা অনিয়মের অভিযোগ উঠলে সরকার কী পদক্ষেপ নেয়, তার ওপরই নির্ভর করবে সরকারের আসল চরিত্র। ‘আমাদের লোক’ আর ‘ওদের লোক’—এই পুরোনো রাজনীতির বাইরে এসে নিজেদের লোকের বিরুদ্ধেও যদি আইনের সমান প্রয়োগ না হয়, তবে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতিশ্রুতি প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
একই কথা প্রযোজ্য দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ক্ষেত্রেও। দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিকে সত্য প্রমাণিত করতে হলে তা হতে হবে শতভাগ দলনিরপেক্ষ। ক্ষমতার কাছের মানুষ বা প্রভাবশালী নেতাদের ছাড় দিয়ে কেবল বিরোধী দলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে তা দুর্নীতিবিরোধী অভিযান নয়, বরং রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হিসেবেই গণ্য হবে। জনগণ এখন রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, বরং বাস্তব দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখতে চায়।
ক্ষমতার অন্যতম প্রধান ঝুঁকি হলো—তা মানুষকে বাস্তবতার চিত্র থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। চারপাশের স্তাবকবৃন্দ, প্রশাসনের তৈরি সাফল্যের গল্প কিংবা দলীয় কর্মীদের ইতিবাচক মতামতের ভেতরে প্রকৃত সত্য ঢাকা পড়ে যায়। অথচ বাজারের সাধারণ ক্রেতা, চাকরিরপ্রার্থী তরুণ বা সরকারি হাসপাতালের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা রোগীর কাছেই রাষ্ট্রের আসল চেহারা পরিষ্কার। তাই সরকারের উচিত প্রশংসার মোহ ত্যাগ করে জনগণের অভিযোগ ও সমালোচনা গুরুত্বের সঙ্গে শোনা।
প্রকৃত অর্থে ‘পরিবর্তন’ মানে কেবল নতুন মন্ত্রী, নতুন প্রশাসন বা নতুন ক্ষমতাকেন্দ্র তৈরি করা নয়। পরিবর্তন মানে আইনের সামনে সবার সমান অধিকার, দুর্নীতি ও দলীয় প্রভাবমুক্ত প্রশাসন এবং সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। এসব জায়গায় ব্যর্থ হলে ক্ষমতার হাতবদল হবে ঠিকই, কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতির কোনো পরিবর্তন ঘটবে না।
রাজনীতিবিদদের মনে রাখা উচিত, জনগণ সাময়িক নীরব থাকলেও সবকিছু পর্যবেক্ষণ করে এবং মনে রাখে। আজ যে ভোটার সমর্থন দিয়েছে, প্রত্যাশা পূরণ না হলে কাল সে-ই সবচেয়ে কঠিন সমালোচক হয়ে উঠবে। দিনশেষে আওয়ামী লীগের পুরোনো ব্যর্থতার গল্প বলে পার পাওয়া যাবে না; বিএনপিকে এখন নিজের কাজের হিসাব দিতে হবে—কতটা কমল দুর্নীতি, কতটা স্বস্তি এলো বাজারে, আর কতটা নিরাপদ হলো সাধারণ মানুষের জীবন। ক্ষমতার শুরুতে জনগণ সময় দেয়, কিন্তু সময় গড়ালেই হিসাবের খাতা খুলতে শুরু করে। আর সেই চূড়ান্ত খাতাটি শেষ পর্যন্ত খুলবে দেশের জনগণই।
